Copyright 2018 - Custom text here

থ্যালাসেমিয়া

User Rating: 5 / 5

Star ActiveStar ActiveStar ActiveStar ActiveStar Active
 

 থ্যালাসিমিয়া একটি বংশগত রোগ এবং জিন (Gene) বাহিত। পিতা-মাতার মাধ্যমে সন্তানেরা পেয়ে থাকে। থ্যালাসিমিয়া শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ Thalassa থেকে। যার অর্থ সমুদ্র। ভূমধ্যসাগর সন্নিহিত অঞ্চলে এ রোগটির প্রাদুর্ভাব বেশি । এজন্য একে থ্যালাসিমিয়া বলা হয়। বংশানুক্রমিক ভাবে এ রোগটি বংশধরদের মধ্যে প্রবেশ করে। জিনের (Gene) মাধ্যমে মূলত এ রোগটি পিতা মাতা থেকে সন্তানে প্রবেশ করে। পিতা ও মাতার কাছ থেকে সন্তানরা এই রোগের একটি করে মোট দুইটি রোগ বাহিত জিন গ্রহণ করলে নিজেরা রোগাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পিতা মাতা আক্রান্ত অথবা বাহক উভয়ই হতে পারেন। বাহক অবস্থায় তাদের রোগের কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে তারা তাদের সন্তানদের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে দিতে পারেন। এটা কোনো ছোঁয়াচ বা সংক্রামক রোগ নয়।

 

প্রকারভেদ:

১।আলফা থ‍্যালাসেমিয়া

২। বিটা থ‍্যালাসেমিয়া

আলফা থ্যালাসেমিয়া :

এই রোগের জন্য  ১৬ নং ক্রোমোজোমে উপস্থিত আলফা চেইন উৎপাদনকারী জিনের mutation বা deletion দায়ী। চারটি জিন দিয়ে আলফা চেইন তৈরি হয়। বাবা-মা থেকে প্রাপ্ত চারটি জিনের মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। যত বেশি জিন ত্রুটিপূর্ণ হবে তত বেশি মারাত্মক সমস্যা দেখা দিবে।যেমন :
o একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়ার কোন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যাবে না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার সন্তানের মধ্যে এই রোগ ছড়াবে।
o দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থাকে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Alpha-thalassemia minor) অথবা আলফা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট ( Alpha-thalassemia trait).
o তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে এর উপসর্গগুলো মাঝারি থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই অবস্থাকে বলে হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ (Hemoglobin H Disease)।
o চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে একে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর (Alpha thalassemia major) অথবা হাইড্রপস ফিটালিস (Hydrops fetalis)। এর ফলে প্রসবের (delivery) পূর্বে অথবা জিনের পরপর ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যায়।

বিটা থ্যালাসেমিয়া:

হিমোগ্লোবিনের বিটা চেইন উৎপাদিত হয় দুটি জিন দ্বারা । বাবা-মা থেকে প্রাপ্ত দুটি জিনের মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে বিটা থ্যালাসেমিয়া হয় এক্ষেত্রে :
o একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যায়। এই অবস্থাকে বলে বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Beta-thalassemia minor) অথবা বিটা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট (Beta-thalassemia trait).
o দুটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে মাঝারি থেকে মারাত্মক উপসর্গ দেখা যায়। এ অবস্থাকে বলে বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর ( Beta-thalassemia major) অথবা কুলিস অ্যানিমিয়া (Cooley’s anemia)। নবজাতক যেসব শিশুর এই সমস্যা থাকে তারা জন্মের সময় বেশ স্বাস্থ্যবান থাকে। তবে জন্মের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই এর উপসর্গ দেখা যায়।

লক্ষণসমূহ:

একই পরিবারের অন‍্য সদস্যদেরও হতে পারে

জন্ডিস

পেশাব হলুদ হয়ে যায়

ক্ষুধামন্দা

হেপাটোম্যাগালি

স্প্লিনোম্যাগালি

জন্ডিস

পেট ফুলে যাওয়া

শারিরীক দূর্বলতা

রক্তশূন্যতা

 কখন ডাক্তার দেখাবেন 

উপরোক্ত লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

 

কোথায় চিকিৎসা করাবেন 

মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

বিশেষায়িত সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল

পরীক্ষাসমূহ:

পূর্ণাঙ্গ রক্ত পরীক্ষা:

 . হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়

  .ই.এস.আর এর মাত্রা বেড়ে যায়

ব্লাড ফিল্ম:

.হেমোলাইটিক এনিমিয়া

 .মাইক্রোসাইটিক হাইপোক্রোমিক এনিমিয়া

সেরাম এল. ডি. এইচ: বৃদ্ধি পায়

সেরাম বিলিরুবিন

হিমোগ্লোবিন ইলেক্টোফোরেসি

 

চিকিৎসা:

রক্ত পরিসঞ্চালন

থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি পূরনের জন্য ‍নিয়মিত রক্ত প্রদান করতে হবে যাতে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ৯ গ্রাম/ডিসিলিটারের(শতকরা ৫৬/ ৫৬%) উপরে থাকে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্তের উপাদান পৃথক করে শুধুমাত্র লৌহিত কণিকা বা রেড সেল দিতে হবে। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়ার ক্ষেত্রে বেশীর ভাগ রোগীরই নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয় না । অনেক রোগীদের কখনই রক্ত দিতে হয় না্। রক্ত পরিসঞ্চালন শুরু করার আগেই থ্যালাসেমিয়ার ধরন নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

কখন রক্ত দেয়া শুরু করতে হবে ?

এটা নির্ভর করে কতগুলো নির্দেশক যেমন- হিমোগ্লোবিন মাত্রা, শারীরিক বৃদ্ধি, মুখমন্ডলের হাড়ের পরিবর্তন, তুলনামূলক বয়স, প্লীহার আকার এবং জীবনযাত্রার মানের উপর যা রোগীর চিকিৎসক এবং অভিভাবকদের বিবেচনা করতে হবে। সাধারনত বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে রক্ত দেওয়া শুরু করতে হয়। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া এবং ই বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতার তীব্রতা এবং উপরোক্ত নির্দেশক বিবেচনা করে রক্ত প্রদান শুরু করতে হবে।

কত দিন পর পর রক্ত দিতে হবে ?

বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারনত ৩ থেকে ৪ মাস পর পর রক্ত দিতে হয়।  থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া এবং ই বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে যদি থ্যালাসেমিয়া মেজরের মতো মারাত্মক রক্তশূন্যতা হয় হবে ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর পর অন্যথায় আরো বেশী ব্যবধানে রক্ত দিতে হবে।

লৌহ নিষ্কাশন

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের দেহে নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালনের ফলে জমা হওয়া অতিরিক্ত আয়রন বের করার জন্য ‍নিয়মিত লৌহ নিষ্কাশক ( Iron Chelator) ওষুধ যেমন- ডেসফেরল, কেলফার গ্রহন করতে হয়। এছাড়া ডেসিরক্স (Deferasirox) নামে নতুন একটি মুখে খাওয়ার ওষুধ এখন ব্যবহৃত হচ্ছে।

কম্বিনেশন থেরাপি কি?

আয়রন জনিত হৃদরোগ থ্যালাসেমিয়া রোগে মৃত্যুর প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক গবেষনাপত্রে দেখা গেছে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় কেলফার ডেসফেরলের চেয়ে বেশী হৃদরোগ সুরক্ষা দেয়। এজন্য ডেসফেরল ও কেলফারের যৌথ চিকিৎসা সুপারিশ করা হয় । গবেষনায় দেখা গেছে যৌথ চিকিৎসায় প্রতিটি ঔষধের কার্যকারিতা একক চিকিৎসা অপেক্ষা বৃদ্ধি পায় এবং কার্যকরভাবে দ্রুত লৌহ নিষ্কাশন করা সম্ভব হয় ।

প্লীহা (Spleen) অপসারন

অনেক থ্যালাসেমিয়া রোগীরই প্লীহা অপসারন করার প্রয়োজন হয় । রোগ ধরা পড়ার পর থেকে নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় পরিমানে রক্ত দেয়া হলে এটি প্রতিরোধ করা যায় । নিম্মোক্ত লক্ষণগুলো দেখা ‍দিলে প্লীহা অপসারন করা প্রয়োজন-

রক্তের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৫ গুন বেড়ে যাওয়া,

প্লীহায় ব্যাথা, প্লীহার আকার অনেক বেড়ে যাওয়া এবং এর কারণে ক্ষুধামন্দা,

প্লীহার কারণে রক্তের সাদা কণিকা এবং প্লেটলেট কমে যাওয়া ।

প্লীহা অপসারনের অপারেশনের আগে অবশ্যই নিউমোনিয়া এবং মেনিনজাইটিস এর টিকা ‍দিতে হবে। এছাড়া অপারেশনের পর সারা জীবন প্রতিদিন পেনিসিলিন ট্যাবলেট খেতে হবে ।

হৃদরোগ

হৃদপিন্ডে অতিরিক্ত আয়রন জমা হওয়ার কারণে সাধারনত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের হৃদরোগ হয়ে থাকে । তবে নিয়মিত লৌহ নিষ্কাশক ঔষধ খেয়ে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব । হৃদ রোগের লক্ষণসমূহ হচ্ছে- বুক ধড়ফড় করা, অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান হারানো, শ্বাসকষ্ট, উপর পেটে এবং বুকে ব্যাথা, শারীরিক পরিশ্রমে অসহনশীলতা, শরীরে পানি আসা । এধরনের কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

হরমোন রোগ

রক্তস্বল্পতা ও অতিরিক্ত আয়রনের কারণে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের হরমোনজনিত রোগ যেমন- কম ও ধীর দৈহিক বৃদ্ধি, দেরীতে বয়ঃপ্রাপ্তি হওয়া, ডায়াবেটিস, হাঁড় ক্ষয় রোগ হতে পারে । এজন্য বাৎসরিক চেকআপ করতে হবে এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে ।

সংক্রামক রোগের চিকিৎসা

অনিরাপদ রক্তের মাধ্যমে রোগীদের দেহে হেপাটাইটিস বি, সি এমনকি এইচ. আই. ভি (H.I.V) সংক্রমিত হতে পারে । এজন্য সবসময় সঠিকভাবে স্ক্রিনিংকৃত রক্তের ব্যবহার নিশ্চত করতে হবে । এছাড়া যেসকল রোগ টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়, তার টিকা প্রদান করতে হবে, যেমন- হেপাটাইটিস বি ।

মানসিক সহায়তা

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অন্যান্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের মত স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হতে দেওয়া উচিত । অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করে এদের জীবনযাপন অহেতুক কঠিন করা উচিত নয় । এছাড়া বয়সন্ধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে এদের যথাযথ মানসিক সমর্থন ও সহায়তা করা উচিত।

 

 

f t g m

প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী : ডা: মো: হেলাল উদ্দিন

ব্যবহারের শর্তাবলী                                               গোপনীয়তার নীতি